sujan chakraborty: একদা লালদুর্গে জলসঙ্কটে মিশছে ধর্মের চোরাস্রোত – west bengal election 2021: water crisis and communalism in jadavpur assembly

Share Now





হাইলাইটস

  • সুলেখা মোড় থেকে কিছুটা এগোলেই চোখে পড়বে গড়িয়ামুখী রাজা সুবোধচন্দ্র মল্লিক রোডের ধারে তৈরি হচ্ছে ‘ভারতমাতার’ মন্দির।
  • ষাটের দশক থেকে যাদবপুর মানেই লালদুর্গ।
  • বিজয়গড়ে প্রচার করছিলেন তৃণমূল প্রার্থী দেবব্রত মজুমদার।

প্রসেনজিৎ বেরা

সুলেখা মোড় থেকে কিছুটা এগোলেই চোখে পড়বে গড়িয়ামুখী রাজা সুবোধচন্দ্র মল্লিক রোডের ধারে তৈরি হচ্ছে ‘ভারতমাতার’ মন্দির। নির্মীয়মাণ সেই মন্দিরের সিংহদুয়ারের টাঙানো ফ্লেক্স। তাতে মন্দির নির্মাণে দানের আহ্বান। সেখান থেকেই কয়েক কিলোমিটার দূরে বাঘাযতীন স্টেশনের গায়েই টকটকে লাল রংয়ের CPIM-এর অফিস। বাঘাযতীন পূর্ব শাখা। যাদবপুরে গত পাঁচ বছর বিধায়ক থাকলেও এই অফিস দীর্ঘ দিন খুলতে পারেনি সিপিএম। ভোটের মুখে অফিস খুলে লাল ঝান্ডা উড়িয়েছে বামেরা। যাদবপুরে (Jadavpur Assembly) ভারতমাতার মন্দির তৈরি হচ্ছে, অথচ CPIMতাদের একটি অফিস খুলতে পারেনি শুনে চমকে যাবেন না! বাঘাযতীন থেকে গাঙ্গুলিবাগান, নয়াবাদ থেকে সন্তোষপুর-সর্বত্রই অলি-গলিতে পতপত করে উড়ছে গেরুয়া ঝান্ডা। সমানতালে পাল্লা দিচ্ছে জোড়াফুল। অন্তত প্রচার জৌলুসে CPIM-এর হেভিওয়েট নেতাকে ছাপিয়ে গিয়েছে তৃণমূল-বিজেপি। খটকাটা এখানেই!

ষাটের দশক থেকে যাদবপুর মানেই লালদুর্গ। ১৯৭২ সালের সেই কুখ্যাত নির্বাচনেও দীনেশ মজুমদার এই কেন্দ্র থেকে দাপিয়ে জয়ী হয়েছিলেন। দাঁত ফোটাতে পারেনি সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের কংগ্রেসও। বিকেশ গুহ, দীনেশ মজুমদার, শঙ্কর গুপ্ত, অশোক মিত্র, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য থেকে সুজন চক্রবর্তী (Sujan Chakraborty)-CPIM-এর একের পর এক তাবড় নেতা এই যাদবপুর থেকে জয়ী হয়েছেন। সেখানে কলোনির পর কলোনিতে ছড়িয়ে রয়েছে বামেদের উদ্বাস্তু আন্দোলনের ইতিহাস। নকশাল আন্দোলনের রক্তাক্ত অধ্যায়। ২০১১ সালে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যর হার যাদবপুরের নির্বাচনী ইতিহাসে একটি ব্যতিক্রম। সেই লালদুর্গে কী ভাবে অলি-গলিতে পদ্ম ফুটেছে? পুরোনো কলোনি এলাকাগুলিতেও উড়ছে পদ্ম-ঝান্ডা। এমন নয় CPIM এখানে প্রান্তিক। এখনও যাদবপুরে অধিকাংশ এলাকায় দাপিয়ে মিছিল করছে লাল ঝান্ডা। তৃণমূল প্রার্থী দেবব্রত মজুমদার CPIM প্রার্থী সুজন চক্রবর্তীকেই তাঁর মূল প্রতিপক্ষ মেনে রণকৌশল সাজিয়েছেন। সেই জায়গায় CPIM থেকে BJP-তে গিয়ে যাদবপুরের প্রার্থী হওয়া ১০২ নম্বর ওয়ার্ডের বিদায়ী কাউন্সিলর রিঙ্কু নস্কর ডার্ক হর্স হওয়ার দৌড়ে। রিঙ্কুকে শক্তি জোগাতে দিলীপ ঘোষ রোড-শো করেছেন। হয়তো কমলের সুবাস পেয়েই বুধবার খোদ অমিত শাহ যাদবপুরে রোড-শো করতে চলেছেন। তাই যাদবপুরের অলিগলি ঘুরে যে প্রশ্নটা উঠছে, তা হলো, এই লালদুর্গে কেন পদ্মের এই বাড়বাড়ন্ত?

বিজয়গড়ে প্রচার করছিলেন তৃণমূল প্রার্থী দেবব্রত মজুমদার। মলয় মজুমদার নামেই পোড়খাওয়া এই বিদায়ী কাউন্সিলরকে সবাই চেনে। দেবব্রতর সাফ কথা, ‘যাদবপুরে যাঁরা CPIMকরতেন, তাঁরাই এখন বিজেপি। যিনি বিজেপি প্রার্থী, তিনিও CPIM-এর কাউন্সিলর ছিলেন। বাম এখন রাম হয়েছে।’ যাদবপুরের বীরনগরের অলিগলিতে জনসংযোগ করতে করতে এর উত্তর দিলেন জোট প্রার্থী সুজন চক্রবর্তী। বাম পরিষদীয় নেতার কথায়, ‘এই প্রচার তৃণমূল শুরু থেকেই করছে কিন্তু এখানে ওয়ার্ড ধরে ধরে দেখিয়ে দিতে পারি কোন ওয়ার্ডে গত লোকসভা ভোটে তৃণমূলের কত ভোট BJP-তে গিয়েছে। বিজেপি তো শুধু যাদবপুরে বাড়েনি সারা পশ্চিমবঙ্গে বেড়েছে।’

এ নিয়ে বিজেপি প্রার্থী কী বলছেন? রিঙ্কু নস্কর ২০১৪-র লোকসভা নির্বাচনে মথুরাপুরে বামেদের প্রার্থী ছিলেন। টইটই করে সারা যাদবপুর ঘুরছেন। শহিদ স্মৃতি কলোনির মতো এলাকায় প্রচার করতে গিয়ে বাধাও পেয়েছেন। পথসভার মঞ্চে দাঁড়িয়ে রিঙ্কুর উত্তর, ‘মানুষ ৩৪ বছর বাম শাসন দেখেছে। ১০ বছরের তৃণমূল শাসন দেখেছে। যে কংগ্রেস বামেদের উপর অত্যাচার করেছে, তাদের সঙ্গে নিয়ে এবংISF-এর সঙ্গে হাত মিলিয়ে বামেরা আদর্শচ্যুত হয়েছে। তাই মানুষ বিকল্প হিসেবে বিজেপিকে চাইছেন।’
ঘরের লোক বনাম মস্তান-তালিকা
আব্বাস সিদ্দিকির (Abbas Siddiqui) ISF-এর সঙ্গে বামেদের জোট কি যাদবপুরের মতো কলোনি অধ্যুষিত এলাকায় এক্স ফ্যাক্টর হতে চলেছে। পূর্ববঙ্গ ছেড়ে আসার স্মৃতি, দেশভাগের সময়ের দাঙ্গার স্মৃতি, কলোনিতে কোনও ভাবে মাথা গুঁজে থাকার অতীতকে বিজেপি কৌশলে এই আব্বাস-ফ্যাক্টরকে কাজে লাগিয়ে উদ্বাস্তু কলোনিগুলিতে অবশিষ্ট বাম ভোটে ধাবা বসাতে চাইছে। তাই যাদবপুরের লালদুর্গে কি তলায় তলায় ধর্মের চোরাস্রোত বইছে? সুজন অবশ্য তা মানতে চাইছে না। তাঁর কথায়, ‘ISF নিয়ে বিজেপি সারা রাজ্যে যে প্রচার করছে এখানেই সেই প্রচার চালাচ্ছে কিন্তু এর কোনও প্রভাব পড়বে না। যাদবপুরের মানুষ সচেতন।’ কিন্তু সুলেখা মোড়ে ভারতমাতার নতুন মন্দির নির্মাণ, অলিতে গলিতে পদ্মফুলের উপস্থিতি কি অন্য ইঙ্গিত দিচ্ছে? চোরাস্রোত যদি থেকেও থাকে তাকে ইভিএমে সম্পূর্ণ টেনে আনার মতো সংগঠন কি তৈরি হয়েছে বিজেপির? এই প্রশ্নও রয়েছে। মেরুকরণের চোরাস্রোত যদি সুজনের কাঁটা হয়, তা হলে দেবব্রতকে অন্য কাঁটা বিঁধছে। একতা হাইটসের মতো অভিজাত আবাসন থেকে কলোনির বাসিন্দাদের মুখে বারবার উঠে আসছে পানীয় জলের সঙ্কটের কথা। দেবব্রত প্রচারে বেরিয়ে অস্বস্তিতে পড়েছেন যখন এক বৃদ্ধা জোড় হাতে বলেছেন, ‘বাবা, খাবার জল পাই না।’ তিনি স্বীকার করছেন, ‘কিছু ওয়ার্ডের কয়েকটি এলাকায় পানীয় জলের সমস্যা রয়েছে। একাধিক জায়গায় কাজ চলছে। বহুতল আবাসনেও সমস্যা রয়েছে।’ জল-যন্ত্রণার কাঁটার পাশে দেবব্রতর গেরুয়া অতীত, সঙ্ঘ ঘনিষ্ঠতা নিয়েও কৌশলে প্রচার চালাচ্ছে বামেরা। তাই মেরুকরণের চোরাস্রোত? না, লাল ঝান্ডার প্রতি টান? নাকি জল না-পাওয়ার মতো দৈনন্দিন জীবনযন্ত্রণার ইস্যু যাদবপুরে ভোট-বৃত্তান্ত তৈরি করবে, তার উত্তর মিলবে ২ মে।
টাটকা ভিডিয়ো খবর পেতে সাবস্ক্রাইব করুন এই সময় ডিজিটালের YouTube পেজে। সাবস্ক্রাইব করতে এখানে ক্লিক করুন।






Source link