COVID19 India: চলে গেলেন সেতারের সেনিয়া ঘরানার উজ্বল নক্ষত্র দেবু চৌধুরী – sitar maestro pandit debu chaudhuri death followed by son prateek chaudhury demise

Share Now





রঞ্জন রায়

গত ১লা মে, দিল্লির এক হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস নিলেন কোভিড আক্রান্ত পন্ডিত দেবব্রত চৌধুরী, সেনিয়া ঘরানার উজ্বল নক্ষত্রটি; সম্ভবতঃ শেষ নক্ষত্র। কারণ, এই ঘটনার পর একটা সপ্তাহও পেরোল না, কোভিডের থাবা শেষ করে দিল তাঁর ছেলে পন্ডিত প্রতীক চৌধুরীকে। প্রতীক পিতা ও গুরুকে হারানোর শোক সামলে ওঠার সময়ও পেলেন না।

এই দ্বিতীয় ওয়েভের বহু আলোচিত ইন্ডিয়া- চৌধুরী মিউট্যান্টের বৈশিষ্ট্য হল এটি কোন পরিবারে একবার ঢুকতে পেলে কাউকে ছেড়ে কথা বলে না। বেঁচে থাকার কবাড্ডি খেলায় দ্রুত সবাইকে ছুঁয়ে আউট করে দেয়।

পন্ডিত দেবব্রত চৌধুরী, অমায়িক সুভদ্র মানুষটি, দিল্লি ও ভারতের সঙ্গীত মহলে দেবু চৌধুরী নামেই সমধিক পরিচিত। জন্মে ছিলেন ১৯৩৫ সালের মে’মাসে; তৎকালীন পূববাংলায়, বর্তমান বাংলাদেশের ময়মনসিংহে। চলে গেলেন ৮৫ বছর বয়সে। কিন্তু ছেলে প্রতীক গেলেন মাত্র ৪৯ বছর বয়সে। সেনিয়া ঘরানার বৈশিষ্ট্য হল রাগের শুদ্ধরূপ, ধ্রুপদাঙ্গের বাদনে জোর, মুড়কির চেয়ে লম্বা মীড়ের প্রয়োগ বেশি। এই প্রসঙ্গে মনে পড়ল বাবা আলাউদ্দিন খানও সেনিয়া ঘরানার। সেই অর্থে পন্ডিত রবিশংকরও সেনিয়া ঘরানার।

এই ঘরানার প্রতিষ্ঠাতা মসিদ সেন। তাঁর নামেই এদের বাজ বা ডান হাতের কাজের শৈলী মসিদখানি বাজ হিসেবে প্রসিদ্ধ। কোলকাতায় ক্যান্সারে আক্রান্ত গুরু উস্তাদ মুস্তাক আলি খাঁর রোগশয্যায় গুরুকে ছুঁয়ে দেবু কথা দিয়েছিলেন—সেনিয়া ঘরানার দীপশিখা অমলিন থাকবে। এই আশ্বাস পাওয়ার পরের দিন গুরু চলে গেলেন। দেবু দিল্লি ফিরে গিয়ে প্রতিষ্ঠা করলেন গুরুকুল, সেনিয়া ঘরানার। ১৯৯১ সালে স্থাপন করলেন উস্তাদ মুস্তাক আলি খান সেন্টার ফর কালচার। নিজের ছেলে প্রতীকও বিকশিত হলেন সেনিয়া ঘরানার শুদ্ধতায়। দেবু কষ্ট পেতেন ফিলহাল কারও কারও দরবারি কানাড়ার মত গম্ভীর রাগে ঠুংরিসুলভ চটুল মুড়কির ব্যবহার দেখে। তবে নিজে খামাজ রাগে ঠুংরিচালের কম্পোজিশনে মুড়কির ব্যবহারে কার্পণ্য করেননি। প্রিয় বাদ্যযন্ত্রটিও সেই ১৭ ফ্রেটের। তাতে আজকালকার প্রচলন অনুযায়ী শব্দের রেঞ্জ ও রেজোন্যান্স বাড়ানোর জন্যে অতিরিক্ত পাতলা তার ও ফ্রেট ইত্যাদি সংযোজনের প্রলোভন সযত্নে এড়িয়ে গেছেন।
‘সঙ্গীর সঙ্গে এক বছর ঘরবন্দি, তবুও…’, বিস্মিত করোনা আক্রান্ত তসলিমা
কর্মজীবনে উনি ছিলেন দিল্লি ইউনিভার্সিটির ফ্যাকাল্টি অফ মিউজিক অ্যান্ড আর্টসের ডীন। সম্মান পেয়েছেন অনেক। উল্লেখযোগ্য সম্মানের তালিকায় রয়েছে পদ্মভূষণ, পদ্মশ্রী ও সঙ্গীত নাটক অ্যাকাডেমির পুরস্কার। রচনা করেছেন বেশ কয়েকটি রাগ, যেমন বিশ্বেশ্বরী, কল্যাণী-বিলাবল, আশিকী-ললিত, অনুরঞ্জনী ও প্রভাতমঞ্জরী। দেবু চৌধুরীর সঙ্গীতের তত্ত্ব ও প্রয়োগ এই দুই বিষয়েই সমান অধিকার। বই লিখেছেন বেশ কয়েকটি। উল্লেখযোগ্য হল Sitar and its Music, এবং শেষ বইটি Ragatma।

সঙ্গীতাচার্য দেবুকে ছেড়ে এখন মানুষ দেবুকে নিয়ে দুটি কথা বলে শেষ করতে চাই। সন ২০০৩ কি ২০০৪।আমার বড় মেয়ে ছত্তিশগড়ের খয়রাগড়ের ফাইন আর্টসের সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি ইন্দিরা কলা সঙ্গীত মহাবিদ্যালয়ে ফাইন আর্টসে গ্র্যাজুয়েশন করছে। সঙ্গীতবিদ ইন্দিরা চক্রবর্তী তখন উপাচার্য। ছাত্রছাত্রীদের আন্দোলন চলছে কিছু সংস্কার করার দাবিতে। উত্তপ্ত বাতাবরণ।
হাতের বাইরে পরিস্থিতি, লাগাতার চারদিন ৪ লাখের গণ্ডি পেরল আক্রান্ত
ইতিমধ্যে দিল্লি থেকে ভারত সরকারের তিনসদস্যের প্রতিনিধিমন্ডল এসেছেন বার্ষিক পরিদর্শনে। দলের নেতৃত্বে পন্ডিত দেবু চৌধুরী । কর্তৃপক্ষ দৃঢ়প্রতিজ্ঞ— ছাত্রদের প্রতিনিধিরা যেন কোনভাবেই কেন্দ্রীয় দলের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ না পায়। তাই পরিদর্শকদের গেস্ট হাউসে রাখা হয়েছে এবং ছাত্রদের ধারেকাছে ঘেঁসতে দেয়া হচ্ছে না।

আজ শেষ দিন, ওঁরা বিকেলে দিল্লি ফিরে যাবেন। সকাল ছ’টায় দেবু চৌধুরী বাগানে পায়চারি করছেন। তিনজন ছাত্র এসে তাঁকে নমস্কার করল। ঢ্যাঙামত মেয়েটি বলল, ‘ভিসি যা দেখিয়েছেন, তাই দেখেই ফিরে যাবেন স্যার? একটিবার মেয়েদের হোস্টলে এসে দেখুন না আমরা কীভাবে আছি। বাথরুমের ভাঙা দরজা, অপরিষ্কার আঙিনা। আর গ্রাফিক্স ও স্কাল্পচার বিভাগের কোন আলাদা বিল্ডিং নেই। ভাঙাচোরা ক্লাসরুমে ছাদ থেকে জল পড়ে? সেন্ট্রাল অনুদানের টাকায় সব খরচা শুধু সঙ্গীত বিভাগের জন্যে করা হয়।

দলের অন্যেরা কাটিয়ে দিতে চাইল, কিন্তু দেবু তক্ষুণি ওদের সঙ্গে গিয়ে সরেজমিনে দেখে বললেন—তোমাদের দাবিগুলো ন্যায্য। আমার রিপোর্টে থাকবে।কিন্তু তোমরা কি জান তোমাদের ভিসি’র তিনদিন ধরে জ্বর? একবারও খোঁজ নিয়েছ? চল আমার সঙ্গে। ছেলেমেয়েদের সংকোচ; কিছুতেই যাবে না। শেষে আমার মেয়ের হাত ধরে বললেন—তুমি অন্ততঃ আমার সঙ্গে চল। এটাও দরকার।
বেলাগাম করোনা, আরও কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ যোগী-কেজরির
ওরা গিয়ে ভিসির বাংলোয় বেল টিপতেই অসুস্থ ডঃ ইন্দিরা চক্রবর্তী বেরিয়ে এসে অবাক। মেয়ে বলল-কেমন আছেন ম্যাম?
উনি কেঁদে ফেলে বললেন- এই লম্বা মেয়েটা!তোকে আজ মারব। তোর জন্যে আমি তোদের ডীনের সঙ্গে ঝগড়া করেছি। আর তুই আমার বিরুদ্ধে শ্লোগান দিচ্ছিলি?

ওরা পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করল। উনি ভেতরে গিয়ে সবার জন্যে প্লেট ভরে মিষ্টি নিয়ে এলেন। আন্দোলনের মধুরেণ সমাপয়েৎ হল।
পন্ডিত দেবু চৌধুরী ফিরে গেলেন দিল্লি। একবছর পরে গিয়ে দেখলাম ইউ-শেপের দোতলা বাড়ি, তাতে ভাস্কর্য ও গ্রাফিক্স বা ছাপাই ছবি বিভাগের জন্যে দুটো আলাদা ফ্লোর। করোনার প্রকোপে এই সঙ্গীতজ্ঞ পরিবারের অকালপ্রয়াণে শুধু সেনিয়া ঘরানার অনুরাগী ছাড়াও আরও অনেকের বুকে কিছু জায়গা খালি হয়ে গেল।

দেশের আরও খবরের জন্য ক্লিক করুন। প্রতি মুহূর্তে খবরের আপডেটের জন্য চোখ রাখুন এই সময় ডিজিটালে।






Source link