চৈত্র শেষের মতুয়া ভোটে ধর্মীয় পরিচয়ই নির্ণায়ক – west bengal assembly election 2021 matua vote share will be effected by religious faith

Share Now





শর্মিষ্ঠা রায়

এইসময়: চৈত্র মাসে বাংলার রং গেরুয়া। তবে সেই গেরুয়ায় জয় শ্রীরামের উগ্র চিৎকার নেই। রয়েছে ঘরের মানুষ বুড়োশিবের গাজনের গানের সুর। গোটা চৈত্র মাস ভর সন্ন্যাসী হন গ্রামবাংলার পুরুষদের অনেকেই। একমাস গেরুয়া পরে, নিরামিষ খেয়ে গ্রামে গ্রামে গাজনের গান গেয়ে বেড়ান তাঁরা। রানাঘাটের হবিবপুরের এক মন্দিরের প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো চড়ক গাছ মাথায় নিয়ে গনগনে আগুনঝরা রোদের মধ্যে খালি পায়ে হাঁটছেন বছর বাইশের যুবক বিনয় পাল। তাঁর সঙ্গে ঢাকের বোল তুলে গাজনের গান গাইছেন প্রবীণ গোবিন্দ শর্মা। রানাঘাট দক্ষিণ বিধানসভার এই এলাকায় মতুয়াদের বাসই বেশি। বিনয় ও গোবিন্দ উঠোনে গিয়ে দাঁড়ালে ভক্তিভরে তাঁদের সামনের রাস্তায় জল ঢেলে দিচ্ছেন মতুয়া বাড়ির মেয়েরাও।
হিন্দুধর্মের অস্পৃশ্যতা, উচ্চবর্ণের ব্রাহ্মণদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে নমোশূদ্র মানুষদের আত্মপ্রতিষ্ঠার লড়াই শুরু করেছিলেন পূর্ববঙ্গের ওড়াকান্দির হরিচাঁদ ঠাকুর। হরিচাঁদের স্লোগানই ছিল ‘বেদ-বিধি শৌচাচার নাহি মানি তাই/কুকুরের উচ্ছিষ্ট প্রসাদ পেলেও খাই’। গ্রামবাংলার ঘরে ঘরে অবশ্য বেদ বিধি মানার চেয়ে লোকায়ত দেবদেবীর অর্চনা করাই দস্তুর। শ্রীচৈতন্যের জন্মভূমি নদিয়ায় তাই যুগলকিশোর, বুড়োশিবের পাশেই ঘরে ঘরে শোভা পায় হরি-গুরুচাঁদের মন্দির। বগুলার সুভাষপল্লির বাড়িতে হরিমন্দির প্রতিষ্ঠা করেছেন শিখা মণ্ডল। মতুয়া ধর্মের উপাসক শিখার একমাথা জটা। তাঁর মাটির বাড়ির উঠোনে শ্বেতপাথরের মন্দিরে হরিচাঁদের সঙ্গেই পুজো পান সাবেক শিব, লক্ষ্মী ও কালীও।

২০১৯ সালে মতুয়া অধ্যুষিত নদিয়ার বহু আসনেই বিপুল ভোটে এগিয়েছিল বিজেপি। তার জন্য মতুয়া ভোটের তৃণমূল ছেড়ে গেরুয়া শিবিরে চলে যাওয়াকেই দায়ী করেন রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা। এ বারও জেলার অনেকগুলি আসনে নির্ণায়ক ভূমিকা নিতে চলেছেন মতুয়ারাই। রানাঘাট উত্তর পূর্বের তৃণমূল প্রার্থী সমীরকুমার পোদ্দারের প্রচারের পোস্টার ব্যানারে জ্বলজ্বল করছে তাঁর গলায় মতুয়াদের আচা-র মালার ছবি। রানাঘাট দক্ষিণ কেন্দ্রের বিজেপি প্রার্থী মুকুটমণি অধিকারীও নিজের মতুয়া পরিচয়কে সামনে রেখেই প্রচার করছেন। রানাঘাটের প্রাক্তন সাংসদ ও বর্তমানে কৃষ্ণগঞ্জ বিধানসভার তৃণমূল প্রার্থী তাপস কুমার মণ্ডলের অধ্যাপক পরিচয়কেও ছাপিয়ে যায় তাঁর মতুয়া পরিচয়।কিন্তু এই জেলার মতুয়া মন এ বার কোন ফুলে?

জেলার বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে দুই ফুলের হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের ছবিটা স্পষ্ট হলেও মতুয়াদের মন বোঝা সহজ হল না। বরং তীব্র ধর্মীয় মেরুকরণের অশুভ ছায়া সর্বত্র। সংগঠনের জোরে এগিয়ে থাকা তৃণমূলের মিছিলে ভিড় হচ্ছে যথেষ্ট। কিন্তু খেলা হবে স্লোগান তুলে মিছিলে হাঁটা তৃণমূলের কর্মী সমর্থকেরা কোন ফুলে ভোট দেবেন তা নিয়ে সংশয় ঘরে বাইরে। বগুলার নোনাগঞ্জ মোড়ে হার্ডওয়্যারের দোকান সমীর টিকাদারের। মতুয়াদের স্থানীয় নেতা সমীর নিজেদের ধর্মীয় আত্মমর্যাদা বজায় রাখতে মরিয়া। বিজেপির মতো ব্রাহ্মণ্যবাদী দলে কী ভাবে মতুয়ারা ভিড় জমাল তা নিয়ে তাঁর মনে ক্ষোভ প্রচুর। তাঁর কথায়, ‘সংখ্যালঘুদের ভয় দেখিয়ে বিজেপি মতুয়াদের দলে টানার চেষ্টা করেছে। আর একদল মানুষ বর্তমান সরকারের কাছ থেকে সবকিছু পাওয়ার পরেও আরও ক্ষমতার লোভে ওদের দলে ভিড়েছে। কিন্তু জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সব বিষয়ে সাহায্য করেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁকে ছেড়ে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।’

তৃণমূল সরকারের আমলে রাস্তাঘাট, স্কুল কলেজ, হাসপাতালের উন্নয়ন যে হয়েছে সে কথা মানছেন সাধারণ মানুষও। রানাঘাট উত্তর পশ্চিম কেন্দ্রের নাসড়া এলাকায় মুখ্যমন্ত্রীর জনসভায় এসেছিলেন তুষার বাইন। ফুচকার ব্যবসায়ী তুষারের কথায়, ‘বিজেপি কী করেছে আমাদের জন্য? উল্টে এনআরসির ভয় দেখিয়েছে।’ পাশেই বুদ্ধদেব পোদ্দারের চায়ের দোকান। তাঁর গলার আচা-র মালাতেই স্পষ্ট তাঁর মতুয়া পরিচয়। তিনি বললেন, ‘লকডাউনে এই সরকার ও স্থানীয় তৃণমূল নেতারা যা করেছেন তাতে এখানে তৃণমূলের হাওয়াই ভারি।’কিন্তু আশঙ্কার মেঘ উড়িয়ে দিতে পারছেন না জ্যোতির্ময় সরস্বতী। দত্তপুলিয়ায় তাঁদের শ্রীমা মহিলা সমিতির মাধ্যমে এলাকার কয়েক হাজার মহিলা স্বনির্ভর হয়েছেন। তিনি বললেন, ‘এই সব এলাকার অনেক উদ্বাস্তু কলোনিতে বিজেপি তাদের জমি শক্ত করেছে। ওপার বাংলা থেকে নির্যাতিত হয়ে আসা মানুষের মধ্যে সংখ্যালঘু তোষণের অভিযোগটা দাগ কেটেছে প্রবল ভাবে।’ রানাঘাট দক্ষিণের বিজেপি প্রার্থী মুকুটমণি অধিকারীও তাঁর প্রচারে তৃণমূলের বিরুদ্ধে তোষণের অভিযোগটাকেই বড় করে দেখাচ্ছেন। কিন্তু এনআরসি নিয়ে অসমের দৃষ্টান্ত ও ডিটেনশন ক্যাম্পের ভয় যে যে সাধারণ মতুয়াদের মধ্যে চেপে বসেছে তা মেনে নিচ্ছেন তিনিও। অমিত শাহ এনআরসি নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের অবস্থান স্পষ্ট না করায় বিভ্রান্তি যে বেড়েছে তা মেনে নিয়ে তাঁর বক্তব্য, ‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কথা দিয়েছেন অসমের ভুল এই রাজ্যে হবে না। আর যদি আমাদের দাবি মতো নিঃশর্ত নাগরিকত্ব না পাই তা হলে তিন কোটি মতুয়ার রাস্তায় নামা তো বন্ধ হবে না। নতুন করে আমাদের যাতে আবার শরণার্থী হতে না হয় তার জন্য আন্দোলনের রাস্তা আমরা বন্ধ করিনি।’
কৃষ্ণগঞ্জের তৃণমূল প্রার্থী তাপস কুমার মণ্ডল অবশ্য মনে করেন না সাধারণ মতুয়ারা তৃণমূলের পাশ থেকে সরে গিয়েছে। তাঁর যুক্তি, ‘এই জেলায় মতুয়াদের ভোট ২৫ থেকে ৩৬%। আর সাধারণ হিন্দু ভোট প্রায় ৫০%। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মতুয়াদের একমাত্র নাগরিকত্বের প্রশ্নটি বাদে বাকি সব দাবিই পূরণ করেছেন। ২০১৯ সালেও মতুয়ারা মমতার পাশ থেকে সরে যায়নি, এবারও যাবে না। সরে গিয়েছিল সাধারণ হিন্দু ভোটারদের একটা অংশ। সেই দুর্নামটা মতুয়াদের বহন করতে হচ্ছে।’ চৈত্রশেষের গাজনমেলায় সম্প্রীতির সুর গ্রামবাংলার চিরন্তন রীতি। কিন্তু চৈত্রশেষের ভোটে ধর্মীয় পরিচয়ই হয়তো নির্ণায়ক হতে চলেছে ইভিএমের ফলাফলে।






Source link