আপনভোলা বেহালাওয়ালা

Share Now






এই সময়: নাম স্বপন শেঠ। বয়স ৭৫। বেহালা বাজানো শখ। শখ আঁকা, মূর্তি গড়াও। শহরের নানা জায়গায় যান বেহালা বাজাতে। পারিশ্রমিক নেন না। ট্যাক্সি বা অ্যাপ ক্যাবে কদাপি নয়। বাসে। ব্যতিক্রমী এক মানুষের খোঁজ দিলেন দেবলীনা ঘোষ

সোশ্যাল মিডিয়ায় এক অনুষ্ঠানের কথা পোস্ট করলেন টেলিভিশনের জনপ্রিয় অভিনেত্রী। আর তারপরই তা ছড়িয়ে পড়লো ঝড়ের গতিতে। সেই পোস্ট শেয়ার করলেন তাঁর সহকর্মী, বন্ধু, শুভাকাঙ্খীরা। দক্ষিণ কলকাতার এক ক্যাফেতে শিল্পী স্বপন শেঠ বেহালা বাজাবেন। বয়স ৭৭বছর। কোনও কেতাবি অনুষ্ঠান নয়। বরং শহরের বিভিন্ন জায়গায় বেহালা বাজাতেই স্বচ্ছন্দ তিনি। বাজনা শুনে ভালো লাগলে কিনতে পারেন সিডি। তবে অন্য কোনওভাবে তিনি কোনও পারিশ্রমিক নেন না।

বেশ কয়েক বছর ধরেই এ ভাবে শহরের বিভিন্ন জায়গায় স্বপনবাবু পৌঁছে যান তাঁর সঙ্গী বেহালা নিয়ে। শহরের বাইরেও গিয়েছেন বহুবার। বেহালা বাজানোর পাশাপাশি ছবি আঁকা, বিভিন্ন ধরনের মূর্তি বানানো তাঁর নেশা। একে করোনা, তার উপর বয়সও হয়েছে। বাজনা বাজাতে বিভিন্ন জায়গায় যাওয়াটা কি উচিত? এই প্রশ্নের উত্তরে স্বপন বাবু বলছেন , ‘বেরোতে তো হবেই। না হলে চলবে কী করে?’ দেশের বিভিন্ন জায়গায় বেহালা বাজাতে শুরু করেছিলেন স্ত্রীর ক্যানসার ধরা পড়ার পর। তবে সে সব অনেকদিন আগের কথা। এখন সম্পূর্ণ সুস্থ তাঁর স্ত্রী। তাই প্রথমেই বলে নিলেন, ‘আমার স্ত্রীকে আর এই বিষয়ে টানবেন না। এখন আমি নিজের ইচ্ছেতেই বাজাই। ভালো লাগে। সেই দুঃসময় চলে গিয়েছে’। তাঁর স্ত্রীর বক্তব্যও এরকমই। নিজের নাম প্রকাশ করতে চাইলেন না কিছুতেই। তবে তাঁর বক্তব্য এ ভাবে তাঁকে নিয়ে টানাটানি করায় তাঁর সায় নেই একেবারেই।

ছোটবেলা থেকেই বাজনা আর আঁকার প্রতি ভালোবাসা স্বপন বাবুর। ‘বেশ কিছুদিন কাজ করতাম বিড়লাদের একটি স্কুলে। কিন্তু মন বসলো না। কিছুদিন চাকরি করার পর তা ছেড়ে দিই। তার থেকে এ ভাবে নিজের ইচ্ছে মতো বাজনা বাজানোই ভালো’, বলছেন তিনি। মুম্বই থেকে দেরাদুন-বিভিন্ন জায়গায় বেহালা বাজানোর আমন্ত্রণ পেয়েছেন তিনি। ‘মানুষকে আমার শিল্পের মাধ্যমে খুশি করতে পারাই আসল কথা। এর থেকে বেশি আর আমার কিছু চাওয়ার নেই। প্রতিদিন সকাল ছ’টা থেকে রাত এগারোটা অবধি নিজেকে নানা কাজে, বাজনায় ব্যস্ত রাখি। ভারতের বিভিন্ন জায়গায় বাজনা বাজিয়েছি। কিন্তু ভারতের বাইরে কোথাও যাওয়া হয়নি। আর বোধহয় কোনওদিন হবেও না’, কিছুটা আক্ষেপ যেন ঝরে পড়লো তাঁর কথায়।

গিরিশ পার্কের বলরাম দে স্ট্রিটের বাসিন্দা স্বপন বাবুকে মাঝেমধ্যেই দেখা যায় ফোরাম মল আর মণি স্কোয়্যারে বাজাতে। যদি ঠিক দিনে যেতে পারেন দেখা হয়ে যাবে আপনার সঙ্গেও। প্রতিদিন বিকেলে নিয়ম করে বেরোন তিনি। তাঁর বাজনা শুনে ভালো লাগলে সিডি কেনেন অনেকে। সেটাই তাঁর ভালো লাগার জায়গা। অর্থ নয়, তাঁর শিল্পের কদর করলেই তিনি খুশি। যেখানেই অনুষ্ঠান থাক না কেন, তিনি পৌঁছে যান বাসে করে। অ্যাপ ক্যাব বা ট্যাক্সি থেকে তিনি শত হস্ত দূরে। বয়স্ক মানুষ দেখে কেউ লিফ্ট দিতে চাইলেও নেন না। সন্তান? রয়েছে। তবে এই নিয়ে কথা বলতে চান না তিনি। ব্যক্তিগত কোনও বিষয় নিয়েই আলোচনা তাঁর পছন্দ নয়। টেলিভিশনের সেই অভিনেত্রীর কথায় ‘এমন মানুষ কোনওদিন দেখিনি। কাকুকে (স্বপন বাবু) যত দেখি অবাক হয়ে যাই। কাকুর জন্য কিছু করতে পারলেই আমি খুশি। কিন্তু চাই না কোনওভাবে আমার নাম সামনে আসুক।’

অনেক ছোট থেকে এ ভাবেই বাজনা বাজাচ্ছেন স্বপন বাবু। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ার এত রমরমা তখন ছিল না। তাই তাঁর কথা ছড়িয়ে পড়েনি এ রকম মুখে মুখে। এতে কি কোনও উপকার হয়েছে? ‘বেহালা বাজিয়ে আমি কোনওদিন কিছু পেতে চাইনি। তখনও কিছু মানুষ শুনতেন। এখনও কিছু মানুষ শোনেন। এর থেকে বেশি কিছু আমার মনে হয় না’, বলছেন স্বপন বাবু।

টাটকা ভিডিয়ো খবর পেতে সাবস্ক্রাইব করুন এই সময় ডিজিটালের পেজে। সাবস্ক্রাইব করতে এখানে ক্লিক করুন।






Source link